www.amadergaibandha.com

দৈনিক আমাদের গাইবান্ধা

শীতল যুদ্ধের পর বিশ্ব কি আবার পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার মুখে

রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সামরিক যানফাইল ছবি: রয়টার্স

সোভিয়েত রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয় ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর। এর মধ্য দিয়ে শীতল যুদ্ধেরও অবসান ঘটে। পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষাও ধীরে ধীরে কমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ১৯৯২ সালে ও চীন ১৯৯৬ সালে সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। অন্যদিকে ১৯৯০ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা স্থগিত করে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া। এর পর থেকে রাশিয়া এখন পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি।

১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার‑টেস্ট‑ব্যান ট্রিটিতে (সিটিবিটি) যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ সই করে। তখন থেকে বিশ্বের শীর্ষ এই তিন সামরিক শক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি। তবে এসব দেশ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মাত্রার পারমাণবিক সক্ষমতা বা পরমাণুশক্তিচালিত নানা অস্ত্র ও ব্যবস্থার পরীক্ষা চালিয়ে আসছে।

কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া যাবে না

ফারহান হক, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপমুখপাত্র

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার কার্যক্রম আবার শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক আগে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘অন্য দেশগুলোর পারমাণবিক পরীক্ষা কর্মসূচির কারণে আমি ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারকে (প্রতিরক্ষা দপ্তর) পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা সমানতালে শুরুর নির্দেশ দিয়েছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে যাওয়ার পথে, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে যাওয়ার পথে, ২৪ অক্টোবর ২০২৫ছবি: এএফপি

ট্রাম্প আসলে কী বুঝিয়েছেন

ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, রাশিয়া ও চীন সম্প্রতি এমন বিস্ফোরকের পরীক্ষা চালায়নি। তবে রাশিয়া সম্প্রতি পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানান, তাঁরা পারমাণবিক সক্ষমতার নতুন বুরেভেস্টনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পরমাণুশক্তিচালিত টর্পেডোর পরীক্ষা চালিয়েছে। পুতিনের দাবি, এসব অস্ত্র তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেই।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প রাশিয়ার এসব নতুন অস্ত্র পরীক্ষার তীব্র সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এর কয়েক দিন পর নিজেই পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার নির্দেশ দিলেন। গত বুধবার রাতে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তাঁর প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার হালনাগাদ ও সংস্কার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি আরও বলেন, চীনের পারমাণবিক কর্মসূচি আর পাঁচ বছরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ের হয়ে যাবে।

১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার‑টেস্ট‑ব্যান ট্রিটিতে (সিটিবিটি) যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ সই করে। তখন থেকে বিশ্বের শীর্ষ এই তিন সামরিক শক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা সময়সাপেক্ষ। তাই যুক্তরাষ্ট্র কত দিনের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের গত আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের আদেশের পর একটি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে ২৪ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার পর
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার পরছবি : লস আলমোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সৌজন্যে

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

ট্রাম্পের ঘোষণার পরে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, ‘মহাসচিব বারবার বলেছেন, বর্তমান পারমাণবিক ঝুঁকি এরই মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুল হিসাব-নিকাশ বা ধ্বংসাত্মক পরিণতির উত্তেজনা বাড়াতে পারে— এমন যে কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে হবে…কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া যাবে না।’

ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্টের পরিচালক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন সিএনএনকে বলেন, ‘ট্রাম্প পরীক্ষা বলতে যদি পারমাণবিক বিস্ফোরকের পরীক্ষা বুঝিয়ে থাকেন, তা হবে অবিবেচনাপূর্ণ। এটা ১৮ মাসের মধ্যে সম্ভব নয়। অন্যদিকে একটি ব্যয়বহুল। এ ছাড়া এটা করার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার হবে।’

রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা নতুন করে শুরু করতে পারে, এমন অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে

জেমস মার্টিন, অধ্যাপক মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর নন–প্রোলিফারেশন স্টাডিজ

ক্রিস্টেনসেন সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালালে তা নিশ্চিতভাবে রাশিয়া, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে উৎসাহিত করবে। তারাও নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা শুরু করবে। নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তেমন একটা লাভবান হতে না পারলেও এসব দেশ অনেক বেশি লাভবান হতে পারবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর নন–প্রোলিফারেশন স্টাডিজের অধ্যাপক জেমস মার্টিন বলেন, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা নতুন করে শুরু করতে পারে, এমন অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

চীনের ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজে পরমাণু অস্ত্র বহরে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৪১ প্রদর্শন করা হয়। ১২ জুন, ২০২৩
চীনের ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজে পরমাণু অস্ত্র বহরে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৪১ প্রদর্শন করা হয়। ১২ জুন, ২০২৩ছবি: এএফপি

সিএনএন ২০২৩ সালে জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন তাদের পারমাণবিক পরীক্ষার স্থানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন সুড়ঙ্গ খনন করেছে, যা উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের তথ্যমতে, রাশিয়ার হাতে প্রায় ছয় হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও প্রায় সমানসংখ্যক ওয়ারহেড রয়েছে। বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশই রয়েছে এই দুই দেশে। অন্যদিকে পেন্টগণের তথ্যমতে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ চীনের হাতে পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।

উল্লিখিত দেশগুলোর বাইরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও উত্তর কোরিয়ার কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়া ঘোষণা না করলেও ইসরায়েলের হাতেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ বিশ্বের মোট ৯টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, বিবিসি ও এএফপি অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *