থেমে নেই মাদক ব্যবসা

থেমে নেই মাদক ব্যবসা

বিষাক্ত মদপানে গাইবান্ধায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর দুই যুগ পরও শেষ হয়নি স্মরণকালের মাদক ট্রাজেডির সেই মামলা। অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালে মাদক ট্রাজেডির মূলহোতা শহরের প্রধান ডাকঘর সংলগ্ন কেদার নাথের উত্তরসূরীরা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন চোলাই মদের ব্যবসা। মোবাইল কল দিলেই জায়গা মতো পৌঁছে দেয় চোলাই মদ। কেদার নাথের বংশধররা ছাড়াও শহরের পাঁচটি স্পটে কেনাবেচা হচ্ছে জীবনঘাতী চোলাই মদ। 

মঙ্গলবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কেদারনাথের ভাতিজা মাদক ব্যবসায়ী বাবু বাসফোরের সঙ্গে কথা হয়, দুই লিটার চোলাই মদের দাম ঠিক হয় ৬শ’ টাকা। কথা মতো মদের বোতল নিয়ে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় হাজির হয় কেদার নাথের ভাতিজা বাবু বাসফোর। তার হাতে ৬০০ টাকা তুলে দিলে মদের বোতল এগিয়ে দেন তিনি।

এরপর সময় সংবাদের প্রতিবেদক পরিচয় জানার পর হতচকিত হয়ে টাকা ফেরৎ দিয়ে সটকে পড়ার চেষ্টা করে বাবু বাসফোর। এরপর তার মুখেই জানা গেল বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর নাম।

মাদক ব্যবসায়ী বাবু বাসফোর জানায়, তার কোনো কাজকর্ম নেই। তাই জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মাদক ব্যবসাকে বেছে নেন তিনি। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা শহরের কাঠপট্টি, গোরস্থানপাড়া, কাচারী বাজার, রেলস্টেশন ও শিল্পকলা একাডেমীর পেছনে পাঁচটি স্পটে চলে রমরমা মাদক ব্যবসা। ওই পাঁচ স্পটে ব্যবসা করে রাজেশ, রুমন, রাজেন, মতিলাল, রতন, সোহেল ও সুশীল।
 
এতো গেল স্থানীয়ভাবে তৈরি চোলাই মদের গল্প। এছাড়াও হোমিওপ্যাথি ওষুধের আড়ালে শহরের বেশকিছু দোকানে বিক্রি হয় রেক্টিফাইড স্পিরিট। মাঝেমধ্যেই র‌্যাব, পুলিশের অভিযানে মাদকের ছোট-খাটো চালান ধরা পড়লেও অধরাই থেকে যায় অন্ধকার জগতের মাফিয়ারা। সচেতন মহল বলছে মাদকের ছোবল ঠেকাতে বিষদাঁত ভাঙার দায়িত্বটা প্রশাসনকেই নিতে হবে। 

গাইবান্ধা নগরিক পরিষদের সদস্যসচিব আরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, শহরের যেসব স্পটে মাদক বেচা-কেনা হয় তা গোপন নয়। স্থানীয় মানুষ-প্রশাসন, সবাই জানে। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। 

গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মোকছুদার রহমান শাহান বলেন, স্থানীয়রা অনেক সময় এসব মাদকের স্পট গুঁড়িয়ে দিতে চায়, কিন্তু তারা সাহস পায় না। কারণ তাদের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক লোকজন জড়িত থাকে তাহলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হবে, সেই ভয়ে সবাই চুপ করে থাকে। 

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক আন্দোলন সময়ের দাবি। মাদকের সঙ্গে অনেক সময় প্রশাসনের অসাধু ব্যক্তিদের নাম শোনা যায়, সে ব্যাপারেও সতর্ক ও সজাগ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের আরও কঠোর অবস্থান দরকার। 

রমরমা মাদকব্যবসার কারণ হিসেবে বিচারহীনতাকেও দায়ী করে থাকেন অনেকেই। এখনো যেমন ঝুলে আছে ১৯৯৮ সালে কেদার নাথের বাড়িতে বিষাক্ত মদপানে শত মানুষ হত্যা মামলার বিচার। দেশের স্মরণকালে গাইবান্ধায় ভয়াবহ ওই মাদক ট্রাজেডিতে শতাধিব মানুষের প্রাণ ঝরে যায়। ১৯৯৮ সালে ১৪ এপ্রিল রাতে বাংলা নববর্ষ পালন করতে গিয়ে বিষাক্ত স্পিরিটে ‘মিথানল’ মেশানো পানীয় সেবন করে তারা মারা যান। এ ঘটনার পর প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচার কাছ শেষ হয়নি।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ওই রাতে গাইবান্ধা জেলা শহরের পোস্ট অফিস সংলগ্ন কেদারনাথ বাসফোরের বাড়িতে বিষাক্ত মদ পান করে দেড় শতাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে গাইবান্ধা সদর ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে তাদের ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শতাধিক মানুষ মারা যান। ওই মাদক ট্রাজেডির শিকার হয়ে অনেকে আজও চোখে ঝাপসা দেখছে। অন্ধত্ববরণ করেছেন কেউ কেউ। 

ওই ঘটনায় গাইবান্ধা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক জাকির হোসেন ১৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাইবান্ধা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক সত্য রঞ্জন ভদ্র গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন। ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠনো হয় মরদেহগুলো। কর্তব্যরত চিকিৎসক ময়নাতদন্ত মুলতবি রেখে মৃত কাবলু, বাকি, সুজন ড্রাইভার, মোহাম্মাদ হোসেন ও বিশুর ভিসেরা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠান। রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্টে মৃতদের ভিসেরায় বিষাক্ত মিথানলের উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়।

পরে ১৯৯৮ সালের ৬ জুলাই মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্তকারী সিআইডির কর্মকর্তা আবদুর রহমান ১৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সরকার রবি ও মৃণাল কান্তির বিরুদ্ধে ২০০২ সালের ২৮ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। চার্জশিট দাখিল করার পর বিচারের জন্য নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথিপত্র গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। 

জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম বলেন, আসামিরা আত্মসমর্পণ না করায় বিচারক তাদের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি পরোয়ানা জারি করেন। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের ১০ মে চার্জ গঠন করা হয়। মামলার স্বাক্ষীসহ নানা জটিলতার কারনে মামলাটির বিচার কাজ এখনো শেষ হয়নি বলে জানান তিনি। 

অন্যদিকে বর্তমান মাদক বেচাকেনা বন্ধে অভিযান অব্যাহত আছে জানিয়ে জেলা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন বলেন, জনবলসহ বিভিন্ন সঙ্কটের মধ্যেও তারা বসে নেই। র‌্যাব-পুলিশের অভিযান বাদ দিয়ে, শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত এক বছরে গাইবান্ধায় চারশ আশিটি অভিযান চালিয়ে একশ নব্বই জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সময় নিউজকে জানান, বেশ কিছুদিন ধরে চোলাই মদের ব্যাপারে তারা বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাচ্ছেন। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে হোমিওপ্যাথি দোকানগুলোতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। চোলাই মদ কিংবা রেক্টিফাইড স্পিরিট যাতে মাদক দ্রব্য হিসেবে অবাধে বেচাকেনা না হয়, সেদিকে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি আছে।  এসবের সাথে যারা জড়িত তাদের কেউই পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। সুত্র: সময় সংবাদ।